টিফিনের ১০ টাকা থেকে মায়ের প্রতিমা! সঞ্চয়ের টাকায় কাগজ-কার্ডবোর্ডে দুর্গা বানিয়ে তাক লাগাল গাজোলের কিশোর
শখ থাকলে সামান্য উপকরণ দিয়েও তৈরি করা যায় অসাধারণ সৃষ্টি করা যায়। তারই অনন্য উদাহরণ মালদার গাজোলের নবম শ্রেণির পড়ুয়া ১৫ বছরের বিক্রম সরকার।
টিফিনের পয়সা থেকে কিছু কিছু করে টাকা বাঁচিয়ে জমিয়েছিল সে। সেই সঞ্চিত অর্থ দিয়েই প্রায় এক মাসের পরিশ্রমে কাগজ ও কার্ডবোর্ড দিয়ে নিজের হাতে তৈরি করে ফেলেছে একচালা দুর্গাপ্রতিমা। আর বিক্রমের তৈরি সেই প্রতিমা এখন তাক লাগিয়েছে।
প্রতিমার উচ্চতা প্রায় দেড় ফুট এবং আড়াই ফুট চওড়া এই দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করতে বিক্রমের খরচ হয়েছে মাত্র প্রায় ৫০০ টাকা। একদিনে নয়, প্রতিদিন একটু একটু করে সময় দিয়ে নিজের কল্পনা আর হাতের কারুকাজে মায়ের রূপ ফুটিয়ে তুলেছে সে। এখন প্রতিমার মূল কাঠামোর কাজ প্রায় শেষ। চলছে সাজসজ্জা এবং মায়ের বাহন তৈরির কাজ।
বিক্রমের এই সৃষ্টির পেছনে রয়েছে ছোট ছোট সঞ্চয়ের গল্প। স্কুলে যাওয়ার সময় পরিবারের কাছ থেকে টিফিনের জন্য যে টাকা পায়, তার মধ্যেই কিছুটা খরচ করে বাকিটা জমিয়ে রাখত সে। সেই জমানো টাকা দিয়েই কিনেছে প্রতিমা তৈরির প্রয়োজনীয় সামগ্রী।
বিক্রমের মা গৌরী দাস সরকার জানান, স্কুলে যাওয়ার সময় ছেলেকে ১০ টাকা করে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই টাকা পুরোটা খরচ না করে বিক্রম অনেকটাই বাঁচিয়ে রাখে। নিজের শখ পূরণ করতে সেই অর্থই কাজে লাগায় সে।
মায়ের কথায়, মোবাইল ফোনে সময় নষ্ট করার বদলে ছেলে নিজের মতো করে নানা সৃষ্টিশীল কাজে ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসে। তার এই আগ্রহে পরিবারও যথেষ্ট খুশি।
ছোটবেলা থেকেই মূর্তি তৈরির নেশা!
দেবদেবীর মূর্তি তৈরির প্রতি বিক্রমের আগ্রহ অবশ্য নতুন নয়। মাত্র ৭-৮ বছর বয়স থেকেই কাগজ ও কার্ডবোর্ড দিয়ে বিভিন্ন ধরনের মূর্তি এবং শিল্পকর্ম তৈরি করে আসছে সে।
কখনও তৈরি করেছে রথ, কখনও জগন্নাথ, কখনও মনসা, আবার কখনও গোপালের মূর্তি। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে দেবী দুর্গা।
নিজের হাতে মায়ের প্রতিমা তৈরি করার আনন্দটাই যেন বিক্রমের কাছে সবচেয়ে বড় পাওনা।
বিক্রম জানায়, সে পুজোর সমস্ত মন্ত্র জানে না। কিন্তু তাতে তার ভক্তিতে কোনও খামতি নেই।
পুজোর দিনগুলিতে বাড়িতেই নিজের তৈরি প্রতিমার সামনে ভক্তিভরে মায়ের আরাধনা করতে চায় সে। ষষ্ঠীর বোধন থেকেই নিজের মতো করে মাকে পুজো করবে বিক্রম।
তারপর প্রতিমাটি বিসর্জন দেওয়ার ইচ্ছা নেই তার। নিজের হাতে তৈরি এই সৃষ্টি যাতে দীর্ঘদিন থেকে যায়, সেই কারণে প্রতিমাটি সংরক্ষণ করতে চায় সে। তবে কেউ যদি আন্তরিকভাবে প্রতিমাটি সংগ্রহ করে রাখতে চান, সেক্ষেত্রে সেটি তাঁকে দিয়ে দিতেও আপত্তি নেই বিক্রমের।
বিক্রমের বাবা বিকাশ সরকার একটি মিলে ঠিকা শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। মা গৌরী দাস সরকার গৃহবধূ। সাধারণ পরিবারের সন্তান বিক্রম। কিন্তু সীমিত সামর্থ্য তার সৃষ্টিশীলতাকে আটকে রাখতে পারেনি।
বাজার থেকে দামি সামগ্রী কিনে নয়, বরং নিজের জমানো টাকা আর হাতের কাছে পাওয়া কাগজ-কার্ডবোর্ডের মতো সামান্য উপকরণকে কাজে লাগিয়েই সে তৈরি করেছে দুর্গাপ্রতিমা।
প্রতিবেশীদের প্রশংসায় খুশি বিক্রম।
বিক্রমের তৈরি দুর্গাপ্রতিমা দেখে প্রতিবেশীরাও যথেষ্ট প্রশংসা করছেন। তাঁর এই প্রতিভা এবং দেবদেবীর প্রতি গভীর অনুরাগ ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে এলাকার মানুষের।
স্থানীয় পুরোহিত আমন কুমার ঝা জানান, দেবদেবীর প্রতি বিক্রমের গভীর অনুরাগ রয়েছে। নিজের হাতে তৈরি দুর্গাপ্রতিমাটিও যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে। এত অল্প বয়সে এমন আগ্রহ এবং নিষ্ঠা সত্যিই প্রশংসনীয়।
একদিকে পড়াশোনা, অন্যদিকে নিজের সৃষ্টিশীল জগৎ—এই দুইয়ের মধ্যে দিয়েই এগিয়ে চলেছে গাজোলের এই কিশোর।
দামি উপকরণ নয়, বড় কোনও কর্মশালা নয়, নেই পেশাদার প্রশিক্ষণও।
আছে শুধু ইচ্ছা, পরিশ্রম, সঞ্চয় আর মায়ের প্রতি অগাধ ভক্তি।
টিফিনের পয়সা থেকে বাঁচানো কয়েকশো টাকা দিয়ে কাগজ-কার্ডবোর্ডে নিজের হাতে মা দুর্গাকে গড়ে তুলেছে বিক্রম। ত
মায়ের আরাধনায় বড় বাজেট নয়, বড় হয়ে ওঠে ভক্তি। আর সেই ভক্তিরই এক সুন্দর উদাহরণ গাজোলের ১৫ বছরের বিক্রম সরকার।